বর্তমানে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯.১৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিগত ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। বৈশ্বিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপের এই সময়ে প্রতিটি সংসারের বাজার বাজেট সামলানো অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করেন, “মনে হয় শুধু হাতে টাকা নিলেই উধাও হয়ে যায়, কিন্তু বাজার ঘর কতটুকুই বা ভরেছে?” এই চিন্তা আপনার মনে আসে কি? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে আপনি একা নন।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক খাদ্য বিষয়ক সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর গড়ে প্রতিটি বাংলাদেশি পরিবার প্রায় ৮২ কেজি খাবার অপচয় করে, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এই অপচয়ের অর্থ সরাসরি আপনার কষ্টার্জিত টাকা। কিন্তু চিন্তা নেই। কিছু সহজ কৌশল ও স্মার্ট অভ্যাস আপনাকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সাহায্য করবে।
আজ আমরা আপনাকে বলব ১২টি কার্যকরী কৌশল, যা আপনাকে বাজারের এই চাপ সামলাতে এবং আপনার কষ্টার্জিত টাকা বাঁচাতে সাহায্য করবে। প্রতিটি টিপস আপনি আপনার দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করে দেখতে পারেন। চলুন, শুরু করা যাক!
কৌশল ১: মাস্টার প্ল্যান তৈরি করুন (একটি বুদ্ধিদীপ্ত তালিকা ও বাজেট)
অধিকাংশ মানুষই বাজারে গিয়ে মনে মনে ভাবেন কী কী লাগবে, কিন্তু গবেষণা বলছে এটি সবচেয়ে বড় ভুল। বাজারে যাওয়ার আগে শুধু একটি তালিকা তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি মাস্টার প্ল্যান।
সঠিক পদ্ধতি: বাজার পরিকল্পনার জন্য “৫০/৩০/২০” সূত্রটি চমৎকার একটি উপায়। এটি একটি বৈজ্ঞানিক বাজেটিং পদ্ধতি। মাসের শুরুতে আপনার পুরো আয়কে ৩ ভাগে ভাগ করে ফেলুন:
৫০% প্রয়োজন: ঘর ভাড়া, ইউটিলিটি বিল, নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার।
৩০% ইচ্ছা: বিনোদন, কেনাকাটা, ভ্রমণ।
২০% সঞ্চয় ও বিনিয়োগ: ভবিষ্যতের জন্য আলাদা করে রাখুন।
বাজারের তালিকা তৈরির সময় স্মার্ট হোন। প্রথমে রান্নাঘর ও ফ্রিজ চেক করুন যে আপনার কাছে কী কী আছে। এরপর পুরো সপ্তাহের জন্য একটি মেনু প্ল্যান তৈরি করুন। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা আগে থেকে সাপ্তাহিক মেনু প্ল্যান করেন, তাদের অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার প্রবণতা অনেক কমে যায়।
মনে রাখবেন, বাজারের জন্য নির্ধারিত বাজেটের চেয়ে কম টাকা হাতে নিন। যেমন আপনার সাপ্তাহিক বাজার বাজেট যদি হয় ২০০০ টাকা, তাহলে হাতে নিন ১৮০০ টাকা। বাকি ২০০ টাকা আলাদা রেখে দিন। জরুরি অবস্থা ছাড়া সেই ২০০ টাকায় হাত দেবেন না। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল, যা আপনাকে বাজেটের মধ্যে থাকতে বাধ্য করবে।
কৌশল ২: সঠিক সময়ে বাজার করা
আপনি কি জানেন, বাজারের সঠিক সময় নির্বাচন করলে ২০-৩০% পর্যন্ত টাকা বাঁচানো সম্ভব? আসুন জেনে নেই, কখন বাজার করা উচিত নয় এবং কখন লাভজনক:
কখন বাজার করা এড়িয়ে চলবেন:
শুক্রবারে: গবেষণায় দেখা গেছে, শুক্রবার বাজারে ক্রেতার চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। এই দিনে বিক্রেতারা ১০-২০% বাড়তি দাম রাখার সুযোগ পান।
উৎসবের আগে: ঈদ, পূজা বা বড় কোনো ছুটির আগে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম চড়া থাকে।
কখন বাজার করবেন (সাশ্রয়ের সেরা সময়):
সপ্তাহের মাঝামাঝি (মঙ্গল-বুধবার): সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে ক্রেতার চাপ কম থাকে, তাই সবজি, মাছ, মাংসের দাম তুলনামূলক কম থাকে।
দিনের শেষে: বাজার বন্ধ হওয়ার আগমুহূর্তে কিনলে দাম অনেক কমে যায়। বিক্রেতারা তখন অবশিষ্ট পণ্য কম দামে বিক্রি করতে আগ্রহী থাকেন।
সকাল সকাল (যদি পাইকারি বাজারের সুযোগ থাকে): কারওয়ান বাজারের মতো জায়গায় রাত ১২টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত পাইকারি বাণিজ্য চলে। এই সময়ে কেনাকাটা করলে খুচরা বাজারের চেয়ে অনেক কম দামে পণ্য কেনা যায়।
কৌশল ৩: বাল্ক বাইং ও পাইকারি কেনাকাটা
যে জিনিসগুলো দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়, সেগুলো একবারে বেশি পরিমাণে কিনে রাখুন। এটি একটি প্রাচীন ও কার্যকরী কৌশল। এটি বিশেষ করে গুঁড়া মসলা, সাবান, শ্যাম্পু ইত্যাদির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
কী কী কিনতে পারেন বাল্কে:
চাল, ডাল, আটা, চিনি, লবণ
তেল (সয়াবিন, সরিষা)
সাবান, ডিটারজেন্ট, টয়লেট্রিজ
পেঁয়াজ, রসুন (ঠান্ডা ও শুকনা জায়গায় রাখতে পারলে)
মনে রাখবেন: বাল্ক কেনার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হোন যে জিনিসগুলো ব্যবহারের আগে নষ্ট হবে না। অন্যথায় টাকা বাঁচাতে গিয়ে উল্টো লোকসান হবে।
অনেকে মনে করেন বাল্কে কেনা মানেই খরচ বাড়ানো, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী। বাংলাদেশি বাজারে বাল্ক কেনা একটি প্রচলিত রীতি, যা অনেক সময় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু কৌশলী হলে তা সাশ্রয়ের অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে।
কৌশল ৪: ব্র্যান্ড নয়, পণ্যের মান দেখুন
একটি চমকপ্রদ তথ্য: কনজিউমার রিপোর্টসের গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই স্টোর ব্র্যান্ড বা লোকাল ব্র্যান্ডের পণ্যের মান নামীদামি ব্র্যান্ডের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং দামে ১৫-২৫% কম। অন্ধ পরীক্ষায় (Blind Taste Test) দেখা গেছে যে, বেশিরভাগ মানুষই স্টোর ব্র্যান্ড ও নামী ব্র্যান্ডের পণ্যের মধ্যে পার্থক্য ধরতে পারেন না।
কেন স্থানীয় ব্র্যান্ড সস্তা হয়? কারণ তাদের পেছনে নামী ব্র্যান্ডের মতো বিশাল মার্কেটিং খরচ থাকে না, যা সরাসরি পণ্যের দামে যুক্ত হয়। বাংলাদেশের বাজারে স্বপ্ন, মীনা বাজার, আগোরার মতো সুপারশপগুলোর নিজস্ব ব্র্যান্ডের পণ্য রয়েছে, যেগুলো কিনলে আপনি ১৫-২০% পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারেন।
সতর্কতা: কোনো পণ্যের দাম কম দেখলেই কিনবেন না। প্যাকেটের গায়ে “ইউনিট প্রাইস” (যেমন: প্রতি কেজি বা প্রতি লিটার দাম) দেখে কিনুন। এতে আসল সাশ্রয় বুঝতে পারবেন।
কৌশল ৫: প্রযুক্তির সহায়তা নিন (ক্যাশব্যাক ও ডিল অ্যাপ)
আমরা স্মার্টফোনের যুগে বাস করছি। কেনাকাটায় সাশ্রয়ের জন্য এখন প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। বাংলাদেশে বর্তমানে বেশ কিছু অ্যাপ ও প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যেগুলো আপনাকে সরাসরি ক্যাশব্যাক বা ডিসকাউন্ট দিচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য কিছু প্ল্যাটফর্ম:
আয়করি (AyyKori): এটি বাংলাদেশের প্রথম ক্যাশব্যাক ও অ্যাফিলিয়েট মার্কেটপ্লেস। এখানে ৩০০টিরও বেশি ব্র্যান্ডের সাথে পার্টনারশিপ রয়েছে। আপনি অনলাইন ও অফলাইনে কেনাকাটা করলে ২০% পর্যন্ত ক্যাশব্যাক পেতে পারেন।
নগদ (Nagad): বিভিন্ন সুপারশপ ও আউটলেটে নগদ অ্যাপের মাধ্যমে পেমেন্ট করলে ১০% বা সর্বোচ্চ ১০০ টাকা পর্যন্ত ক্যাশব্যাক পাওয়া যায়।
ক্লিকএনপে (cliQnpay): এটি মুদি পণ্য কেনার জন্য বিশেষভাবে তৈরি একটি অ্যাপ, যেখানে আকর্ষণীয় ডিল, কুপন ও রিওয়ার্ড পাওয়া যায়।
এছাড়া, আপনার ব্যাংকের ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের সাথেও অনেক সময় বিশেষ ডিসকাউন্ট অফার থাকে। যেমন, এনসিসি ব্যাংকের কার্ডে চালডালে ৫% সাশ্রয় করা যায়। বিভিন্ন ই-কমার্স সাইটেও আকর্ষণীয় ডিল থাকে। চালডাল ও বিকাশের অফারে ১২০০ টাকার বেশি কেনাকাটায় ৫% ইনস্ট্যান্ট ক্যাশব্যাক পাওয়া যায়। ফুডপান্ডার মাধ্যমেও মুদি পণ্য কিনতে পারেন।
কৌশল ৬: মৌসুমি পণ্য কিনুন
মৌসুমি পণ্য কেনা শুধু স্বাস্থ্যকরই নয়, এটি অর্থ সাশ্রয়েরও একটি চমৎকার উপায়। যে কোনো মৌসুমি ফল বা সবজি যখন বাজারে প্রচুর পরিমাণে ওঠে, তখন তার দাম স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
উদাহরণ: দামডেখি ডট কম-এর তথ্য অনুযায়ী, আমের মৌসুমের শীর্ষ সময়ে (জুন-জুলাই) দাম সর্বনিম্ন থাকে, কিন্তু মৌসুম শেষে দাম ৩-৪ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। গ্রীষ্মে বরবটি বা পুঁইশাকের দাম যেমন কম থাকে, তেমনি শীতকালে ফুলকপি, টমেটোর দাম তুলনামূলক কম থাকে।
স্বপ্ন-এর মতো কিছু সুপারশপ সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য কিনে মধ্যস্বত্বভোগী বাদ দিয়ে ক্রেতাদের কম দামে পণ্য দেয়। তাদের অ্যাপ বা ওয়েবসাইট চেক করে দেখতে পারেন।
কৌশল ৭: বাজার করার স্টাইল পরিবর্তন করুন (অনলাইন শপিং)
আজকাল অনেকেই বাজারে গিয়ে ভিড় ঠেলে কেনাকাটা করতে পছন্দ করেন না। বরং তারা বেছে নিচ্ছেন অনলাইন শপিং। অনলাইনে কেনাকাটার অন্যতম সুবিধা হলো, আপনি একাধিক দোকানের দাম সহজেই তুলনা করতে পারবেন এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার প্রলোভন থেকে বাঁচতে পারবেন।
বাংলাদেশে বর্তমানে নির্ভরযোগ্য কয়েকটি অনলাইন গ্রোসারি প্ল্যাটফর্ম হলো:
চালডাল (Chaldal)
স্বপ্ন (Shwapno)
দারাজ মার্ট (Daraz Mart)
অনলাইনে কেনার সময় ডেলিভারি চার্জের দিকে খেয়াল রাখবেন। অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার বেশি কেনাকাটা করলে ডেলিভারি ফ্রি হয়ে যায়। আবার, অ্যাপের মাধ্যমেও কেনাকাটা করলে অনেক সময় বিশেষ ছাড় পাওয়া যায়।
কৌশল ৮: নিজের সবজি নিজেই ফলানোর চেষ্টা করুন
শুনতে অবাক লাগলেও, শহরের ছাদে বা বারান্দায় অল্প পরিশ্রমে নিজের প্রয়োজনীয় কিছু সবজি ফলানো সম্ভব। ঢাকা শহরের অনেকেই এখন ছাদে টব বা পুরনো বালতিতে টমেটো, কাঁচা মরিচ, ধনেপাতা, লাউ, পুঁইশাক ইত্যাদি ফলাচ্ছেন। এটি আপনার বাজারের খরচ যেমন কমাবে, তেমনি নিশ্চিন্তে ভেজালমুক্ত সবজি খেতে পারবেন। শুধু শখের বশেই নয়, এটি হয়ে উঠেছে সাশ্রয়ের একটি বাস্তবসম্মত ও আনন্দদায়ক উপায়।
কৌশল ৯: হ্যাগলিং বা দরদাম করুন নির্দ্বিধায়
আমাদের দেশের কাঁচাবাজারে দরদাম করা একটি শিল্প ও সংস্কৃতি। কিন্তু অনেকেই হয়তো লজ্জায় বা জড়তায় দরদাম করতে পারেন না। মনে রাখবেন, দরদাম করাটা দোষের কিছু নয়, বরং এটি আপনার বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।
কীভাবে করবেন স্মার্ট দরদাম:
একাধিক দোকান থেকে দাম জিজ্ঞেস করুন: প্রথমেই কোনো পণ্য কিনবেন না। দুই-একটা দোকান ঘুরে দাম জিজ্ঞেস করুন। তাহলে আপনি গড় বাজারদর সম্পর্কে একটি ধারণা পাবেন।
বিক্রেতার সাথে সম্পর্ক তৈরি করুন: নিয়মিত যে দোকান থেকে কেনেন, সেখানকার বিক্রেতার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখুন। এতে তারা অনেক সময় ভালো দাম দিতে আগ্রহী হয়।
কর্তৃত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাথে কথা বলুন: কোনো দোকানে দরদাম করে দাম কমাতে না পারলে, বিক্রেতার চেয়ে তার ঊর্ধ্বতন কারও সাথে কথা বললে অনেক সময় আরও কম দামে পণ্য কেনা যায়।
কৌশল ১০: ইম্পালস বাইং (আবেগী কেনাকাটা) বন্ধ করুন
বাজারে গিয়ে অনেক সময় আমরা পরিকল্পনা ছাড়াই অনেক জিনিস কিনে ফেলি, যেগুলো আমাদের আসলে প্রয়োজন নেই। একে বলা হয় “ইম্পালস বাইং”। সুপারশপগুলোতে চকচকে প্যাকেট, আকর্ষণীয় অফার দেখিয়ে আমাদের এই আবেগী কেনাকাটায় প্ররোচিত করা হয়। এটি বন্ধ করতে কিছু কৌশল অবলম্বন করতে পারেন।
আবেগী কেনাকাটা বন্ধের ৫ কৌশল:
পেট ভরে বাজারে যান: খালি পেটে বাজারে গেলে অনেক অপ্রয়োজনীয় খাবার কিনে ফেলার সম্ভাবনা থাকে।
তালিকা মেনে চলুন: তালিকা তৈরি করে, সেটা থেকেই শুধু কেনার প্রতিজ্ঞা করুন।
ই-কমার্স অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ করুন: বিভিন্ন অ্যাপের আকর্ষণীয় অফারের নোটিফিকেশন আপনাকে প্রলুব্ধ করে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় ঠেলে দিতে পারে।
“৩০ দিনের নিয়ম” মেনে চলুন: অপ্রয়োজনীয় কিছু কিনতে ইচ্ছা করলে, ৩০ দিন অপেক্ষা করুন। যদি ৩০ দিন পরও সেই জিনিসটির প্রয়োজন মনে হয়, তবেই কিনুন।
প্রমোশনাল ইমেইল থেকে সাবস্ক্রাইব বাতিল করুন: বিভিন্ন কোম্পানির পাঠানো আকর্ষণীয় অফারের ইমেইল থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিন।
কৌশল ১১: খাবার সংরক্ষণ ও শূন্য অপচয় রান্না
খাবার অপচয় রোধ করা মানে সরাসরি টাকা বাঁচানো। আপনি কি জানেন, আমরা প্রায়শই যে সবজির খোসা বা ডাটা ফেলে দিই, তা দিয়েও দারুণ সব খাবার তৈরি করা যায়? বাংলার ঐতিহ্যবাহী রান্নায় “জিরো-ওয়েস্ট কুকিং” একটি পুরনো ধারণা।
কীভাবে করবেন:
শাকসবজির খোসা ব্যবহার: লাউ, কুমড়ার খোসা দিয়ে মজাদার ভর্তা বা তরকারি রান্না করা যায়। আলুর খোসা তেলে ভেজে মুখরোচক নাস্তা বানানো যায়।
ডাটা ও শিকড়: ফুলকপির ডাটা, মুলার শাক বা পালং শাকের শিকড় দিয়ে ভিন্ন স্বাদের তরকারি রান্না হয়।
ফ্রিজ ও প্যান্ট্রি গোছানো: ফ্রিজে কী কী খাবার আছে, তা নিয়মিত চেক করুন। যেগুলো দ্রুত নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা, সেগুলো আগে রান্না করে ফেলুন।
বাংলাদেশি পরিবারগুলোতে প্রচুর পরিমাণে খাবার নষ্ট হয়। একটু সচেতন হলেই এই অপচয় রোধ করে আপনি আপনার বাজারের খরচ অনেকখানি কমিয়ে আনতে পারেন।
কৌশল ১২: বাজারদরের হিসাব রাখুন (প্রাইস বুক তৈরি করুন)
শেষ যে কৌশলটি আপনার বাজার খরচে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে, তা হলো একটি ব্যক্তিগত “প্রাইস বুক” তৈরি করা। নিয়মিত যে পণ্যগুলো কিনে থাকেন, সেগুলোর দাম একটি খাতায় বা মোবাইল অ্যাপে লিখে রাখুন। এতে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন, কোন দোকানে কোন পণ্যটি সবচেয়ে কম দামে পাওয়া যায় এবং কখন কোন পণ্যের দাম বাড়ে বা কমে।
আপনি চাইলে ম্যানুয়ালি একটি খাতায় লিখতে পারেন, অথবা মোবাইলে প্রাইস বুক অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, সরকারি সংস্থা ডিএনসিআরপি (জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর)-এর একটি অফিসিয়াল অ্যাপ “বাজারদর” ব্যবহার করতে পারেন। এই অ্যাপের মাধ্যমে আপনি জেলা ভিত্তিক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর জানতে পারবেন। এছাড়াও বেসরকারিভাবে “বাজারদর” নামে আরেকটি অ্যাপও রয়েছে যেখানে প্রতিদিনের বাজারদর আপডেট করা হয়। এই তথ্যগুলো আপনাকে ঠকা থেকে বাঁচাবে এবং সঠিক দামে পণ্য কিনতে সাহায্য করবে।
উপসংহার
আমরা আলোচনা করলাম বাজার করার সময় টাকা বাঁচানোর ১২টি দারুণ কৌশল। কৌশলগুলো এক নজরে দেখে নেওয়া যাক:
কৌশল ১: বাজারে যাওয়ার আগে পুরো সপ্তাহের মেনু প্ল্যান ও বাজেট তৈরি করুন (৫০/৩০/২০ সূত্র মেনে)।
কৌশল ২: বাজারের ভিড় এড়িয়ে সপ্তাহের মাঝামাঝি বা দিনের শেষে বাজার করুন।
কৌশল ৩: চাল, ডাল, তেলের মতো পণ্যগুলো পাইকারি দরে বাল্কে কিনুন।
কৌশল ৪: নামী ব্র্যান্ডের মোহ ত্যাগ করে স্টোর ব্র্যান্ডের পণ্য কিনুন।
কৌশল ৫: প্রযুক্তির সহায়তা নিন; ক্যাশব্যাক ও ডিল অ্যাপ ব্যবহার করুন।
কৌশল ৬: মৌসুমি ফল ও সবজি কিনুন, অসময়ের দামি পণ্য এড়িয়ে চলুন।
কৌশল ৭: ইচ্ছা করলে অনলাইন শপিং করুন, দাম তুলনা করার সুবিধা নিন।
কৌশল ৮: ছাদে বা বারান্দায় নিজের প্রয়োজনীয় কিছু সবজি ফলান।
কৌশল ৯: নির্দ্বিধায় দরদাম করুন, এটি আপনার অধিকার।
কৌশল ১০: আবেগী হয়ে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা বন্ধ করুন।
কৌশল ১১: শূন্য অপচয় রান্নার কৌশল আয়ত্ত করুন, খাবারের প্রতিটি অংশ কাজে লাগান।
কৌশল ১২: একটি ব্যক্তিগত “প্রাইস বুক” তৈরি করে বাজারদরের হিসাব রাখুন।
মনে রাখবেন, এই ১২টি কৌশলের কোনোটিই রাতারাতি জাদুর মতো কাজ করবে না। এটি একটি ক্রমাগত শেখার ও অভ্যাস গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। আপনি যদি ধীরে ধীরে এই অভ্যাসগুলো রপ্ত করতে পারেন, তাহলে দেখবেন মাস শেষে আপনার হাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা জমা থাকছে। আজই শুরু করুন, আর আপনার কষ্টার্জিত টাকা বাঁচান।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)
প্রশ্ন ১: বাজার করার সময় সবচেয়ে বেশি টাকা অপচয় হয় কোন কোন ক্ষেত্রে?
উত্তর: সাধারণত আমরা অপরিকল্পিত কেনাকাটা, খাবারের অপচয় এবং ব্র্যান্ডের পেছনে অন্ধ আনুগত্যের কারণে সবচেয়ে বেশি টাকা নষ্ট করি। এর বাইরে, খালি পেটে বাজারে যাওয়া বা বিক্রেতার প্রলোভনে পড়ে তালিকা বহির্ভূত জিনিস কেনাও অর্থ অপচয়ের বড় কারণ।
প্রশ্ন ২: মাসিক বাজার বাজেট কীভাবে তৈরি করবো?
উত্তর: প্রথমে পুরো মাসের আয় হিসাব করে তাকে “প্রয়োজন”, “ইচ্ছা” ও “সঞ্চয়” – এই তিন ভাগে ভাগ করুন। এরপর পরিবারের সদস্য সংখ্যা, খাদ্যাভ্যাস ও সম্ভাব্য বাজারদর বিবেচনা করে সাপ্তাহিক ও মাসিক বাজারের জন্য একটি বাজেট ঠিক করুন। বাজেটের টাকা আলাদা করে রাখুন এবং বাজারে যাওয়ার সময় পুরো টাকা না নিয়ে একটু কম নিয়ে যান।
প্রশ্ন ৩: অনলাইনে বাজার করা নাকি বাজারে গিয়ে কেনা – কোনটি বেশি সাশ্রয়ী?
উত্তর: এটি নির্ভর করে আপনার ব্যক্তিগত অভ্যাস ও পরিস্থিতির উপর। অনলাইনে কেনার সুবিধা হলো আপনি সহজেই বিভিন্ন জায়গার দাম তুলনা করতে পারেন এবং আবেগী ক্রয় এড়াতে পারেন। তবে ডেলিভারি চার্জের কারণে মাঝেমধ্যে খরচ বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, বাজারে গিয়ে সরাসরি পণ্যের মান দেখে দরদাম করে কেনা যায়। তাই উভয় মাধ্যমের ভালো-মন্দ বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই ভালো।
প্রশ্ন ৪: জিরো-ওয়েস্ট রান্না বলতে আসলে কী বোঝায়?
উত্তর: জিরো-ওয়েস্ট রান্না হলো খাদ্যদ্রব্যের প্রতিটি অংশ ব্যবহার করে রান্নার একটি কৌশল, যাতে কোনো কিছুই ফেলে দেওয়া না হয়। যেমন, সবজির খোসা, ডাঁটা, শিকড় ইত্যাদি দিয়ে ভর্তা বা তরকারি রান্না করা, বাড়তি ভাত দিয়ে পরের দিন পোলাও বা খিচুড়ি বানানো ইত্যাদি। এটি খরচ কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব একটি অভ্যাস।
প্রশ্ন ৫: স্টোর ব্র্যান্ড বা লোকাল ব্র্যান্ডের পণ্য কি মানসম্মত?
উত্তর: অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ স্টোর ব্র্যান্ডের পণ্যের মান নামীদামি ব্র্যান্ডের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কারণ এই পণ্যগুলোর পেছনে বড় কোনো মার্কেটিং খরচ থাকে না, ফলে একই মানের পণ্য কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হয়। তাই অন্ধভাবে ব্র্যান্ড না দেখে পণ্যের মেয়াদ, উপকরণ ও ইউনিট প্রাইস দেখে কেনা উচিত।